:
Breaking News

আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা

আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা

দিন দিন আমরা বড় স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছি।আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা ক্রমশ গ্রাস করছে আমাদের।মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা আমরা ভুলে যাচ্ছি।সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে - কথাটা আজ যেন শুধু পুস্তকেই সীমাবদ্ধ,নতুন প্রজন্মের মধ্যে তার কোনো প্রভাব নেই।নিজের নিয়েই ব্যস্ত সবাই।কিন্তু এমন একটা সময় ছিল,যখন কোনও অন্যায় চোখে পড়লেই সমাজের অধিকাংশ মানুষ প্রতিবাদে গর্জে উঠত।রাস্তায় নামত মানুষ,সংগঠিত হতো মিছিল,উঠত প্রতিবাদের ঝড়।কারো কোনো বিপদ হলে নিজের জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়তো তারা।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় মানুষের মানসিকতার উন্নয়ন ও প্রসার হয়নি।এখন নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কারো কোনো কিছু দেখার সময় নেই।আধুনিক সমাজের অজুহাতে তরুণ প্রজন্মকে আত্মকেন্দ্রিক করে গড়ে তুলছে বর্তমান সমাজব্যবস্থা।গ্রামাঞ্চলে বহুল প্রচলিত একটা কথা আছে,নিজে বাঁচলে বাপের নাম।শিশুকাল থেকে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে বেড়ে ওঠার জন্য এই বাক্যটিই যথেষ্ট।ছোটবেলায় আমাদের সন্তানকে আমরা যা শেখাই তার প্রভাব তার জীবনে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বিদ্যমান থাকে।পরিবারের সঙ্গে বর্তমান পরিবেশ আমাদের আত্মকেন্দ্রিক করে গড়ে তুলছে।চলার পথে রাস্তাঘাটে কেউ যদি বিপদে পড়ে,তা দেখে অনেকেই এখন মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়,মনে করে কি দরকার অন্যের ঝামেলায় নিজেকে জড়ানোর।আজ আমরা অনেক বেশি বিশ্বায়িত হলেও একই সঙ্গে আরও বেশি বিশ্ববিমুখ।সচেতনতা যেন আজ সমাজমাধ্যম নির্ভর হয়ে উঠেছে।সেখানে কয়েকটি উষ্ণ মন্তব্যেই যেন সামাজিক দায়িত্ববোধ পালন সম্পন্ন হয়ে যায়।বাস্তব জীবনে কেউ আর প্রশ্ন তোলে না,প্রতিবাদ আন্দোলনে অংশ নেয় না। কারণ,প্রশ্ন করাও আজ যেন বারণ।আজ আমরা আমাদের সন্তানদের শেখাই, কেবল নিজেরটা বুঝে নিতে, ঝামেলায় না জড়াতে।সামাজিক দায়বদ্ধতা এখন ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত।বাসে চড়ে যাওয়ার সময় যদি দেখি রাস্তায় কোনও মিছিল বা অবরোধ,সঙ্গে সঙ্গে বিরক্তি ঝরে পড়ে মুখে।কিন্তু ওই বিরক্তির আড়ালে আমরা বুঝতে চাই না,আন্দোলনের কারণটা কি,কেউ কি অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে ? নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ফরাসি সাহিত্যিক রোম্যাঁ রোলাঁ বলেছিলেন, 'যেখানে শৃঙ্খলা অন্যায়কে টিকিয়ে রাখে,সেখানে বিশৃঙ্খলাই ন্যায়ের সূচনা।' অথচ আজকের সমাজে শৃঙ্খলাভঙ্গ বা প্রতিবাদকে তীব্র নেতিবাচক চোখে দেখা হয়।কোনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ রুখে দাঁড়ালে বা প্রশ্ন তুললে তাকে 'সমাজবিরোধী' তকমা দেওয়া হয়।বর্তমান যুবসমাজকে এমনভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে,যাতে তারা নিজের ভবিষ্যত নিয়েই ব্যস্ত থাকে,আর সামাজিক প্রশ্নে নীরব থাকে।যদিও প্রতিবাদ আন্দোলন করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এমন ভাবাটা ভুল,কিন্তু মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকাটাও বাঞ্ছনীয় নয়।আমরা যেন ভুলে না যাই,সমাজে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা কেবল শাসকের দায়িত্ব নয়,নাগরিকদেরও নৈতিক দায়িত্ব।এই আধুনিক নেট নির্ভর নিস্পৃহতার যুগে আমরা যদি কোনো মানুষের ওপর অন্যায় হচ্ছে দেখেও চুপ থাকি তাহলে বুঝতে হবে আমাদের সভ্যতা সত্যিই এক ভয়াবহ বিপদের পথে চালিত হচ্ছে।বিশ্বায়িত হয়েও বিশ্ববিমুখ হয়ে ওঠা এই সময়ের সবচেয়ে বড় আত্মবিরোধ।আর এখান থেকে যদি বেরিয়ে আসতে হয় তাহলে প্রয়োজন সাহস,প্রয়োজন মানবিকতা,আর প্রয়োজন প্রশ্ন করার অভ্যাস।আমরা যদি এখনই না জাগি,তাহলে ভবিষ্যত প্রজন্ম কিন্তু আমাদের কখনোই ক্ষমা করবে না।তাই আসুন, আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে বের হয়ে এসে বিপদে আপদে একে অন্যের পাশে দাঁড়াই,গড়ে তুলি একটা সুস্থ স্বাভাবিক সমাজ ব্যবস্থা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *